বর্তমান ডিজিটাল যুগে মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহারের মাত্রাতিরিক্ত প্রবণতার কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ঘাড় ব্যথা ও বিভিন্ন মাংসপেশী ও অস্থিসংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা (RUD)-তে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি বিশেষ স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি।
“Neck Pain & Device-Related Physiotherapy Awareness Program for University Students (Mobile/Laptop Users) and University Blood Donation Awareness Program” শীর্ষক এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয় শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০২৬, সকাল ১০টা থেকে ১১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের তেজগাঁও শিল্প এলাকা ক্যাম্পাসে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতায় ছিল রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকা ও রোটার্যাক্ট ক্লাব অব ঢাকা গ্রিন সিটি। পুরো আয়োজনটি পরিচালিত হয় রোটারির বৈশ্বিক থিম “Unite for Good” অনুসরণ করে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র পরিবেশে উদ্বোধন ও স্বাগত বক্তব্য প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আফরিন আখতার মিম। এরপর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পর্বে কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য তুলে ধরেন রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকার ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. মোশিউর রহমান। তিনি বলেন, “বর্তমান শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিনির্ভর হলেও তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা এখন সময়ের দাবি। এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের সুস্থ ও কার্যকর জীবনযাপনে সহায়ক হবে।”

পরবর্তী পর্বে বক্তব্য দেন ফ্যাকাল্টি অব আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর ডিন ড. দিপু সিদ্দিকী। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঘাড় ব্যথা, পিঠ ব্যথা, কাঁধ ও হাতের সমস্যাসহ বিভিন্ন মাংসপেশীজনিত জটিলতা বাড়ছে। এসব সমস্যা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে তা দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে।
এ সময় রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকা এবং রোটার্যাক্ট ক্লাব অব ঢাকা গ্রিন সিটি-এর প্রতিনিধিরাও বক্তব্য রাখেন। তারা তরুণ সমাজের স্বাস্থ্য ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে রোটারির ভূমিকা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল কী-নোট সেশন, যা পরিচালনা করেন দেশের স্বনামধন্য ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ ডা. এম. ইয়াছিন আলী, চেয়ারম্যান ও চীফ কনসালটেন্ট – ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল । তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বর্তমানে ‘টেক্সট নেক সিনড্রোম’ একটি নীরব মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। ভুল ভঙ্গিতে মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহারের ফলে ঘাড়ের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা ধীরে ধীরে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও স্নায়বিক সমস্যার সৃষ্টি করে।”

ডা. এম ইয়াছিন আলী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ঘাড় ব্যথার কারণ, উপসর্গ, প্রতিরোধ ও ফিজিওথেরাপিভিত্তিক চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি সঠিক ভঙ্গিতে বসা, স্ক্রিনের উচ্চতা ঠিক রাখা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া, সহজ স্ট্রেচিং ও এক্সারসাইজ করার গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়েই ফিজিওথেরাপি নিলে বড় ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এরপর অনুষ্ঠিত হয় রক্তদান সচেতনতামূলক সেশন, যা পরিচালনা করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। এই পর্বে রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা, নিরাপত্তা ও সামাজিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়। বক্তারা জানান, নিয়মিত ও স্বেচ্ছায় রক্তদান করলে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব এবং তরুণদের এ ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে আসা উচিত।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে সমাপনী ও কৃতজ্ঞতা বক্তব্য প্রদান করেন অনুষ্ঠানের সভাপতি ও সেশন চেয়ার, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর (ডিজিগনেট), রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা। তিনি বলেন, “শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করাও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব। এ ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।”

অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অংশগ্রহণকারীরা এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও অত্যন্ত কার্যকর বলে অভিহিত করেন।
সচেতনতা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধকে একত্রে তুলে ধরার মাধ্যমে এই কর্মসূচি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনস্বার্থমূলক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে আয়োজকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।